...

হোয়াটসঅ্যাপ : 01950-886700

পাওয়ার,সেক্স, সুইসাইড

গল্পটা অনেক পুরনো। আর এই গল্পটা যতটা না পুরনো, তার থেকে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং। মানুষের বয়স যত বেশি বাড়তে থাকে, গল্পগুলো ধীরে ধীরে একঘেঁয়ে হতে থাকে। একটা ইন্টারেস্টিং গল্পের জন্য আমরা অপেক্ষা করে থাকি। এই গল্পটা আক্ষরিক অর্থেই আপনাকে হতাশ করবে না। ­

আফ্রিকাতে এক ধরনের কুমির পাওয়া যায়, নাম নীল নদের কুমির। ইংরেজিতে বলে Nile Crocodile। এই কুমিরদের দাঁতের ফাঁকগুলো একটু বেখাপ্পা ধরনের। খানাপিনার পরে দাঁতের ফাঁকে অনেক মাংস লেগে থাকে। এই মাংস পঁচে গিয়ে ওদের দাঁতে ইনফেকশন হয়ে যায়। তবে এই কুমিরগুলো এই সমস্যার একটা আজব সমাধান বের করেছে। প্লাভার নামে এক ধরনের পাখি আছে, দেখতে কিছুটা চড়ুই পাখির মতো। দাঁতের মধ্যে মাংস আটকে গেলে কুমিরগুলো বিশাল একটা হা করে, আর এই প্লাভার গিয়ে কুমিরের মুখের মধ্যে ঢুকে পরে। তারপর দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংস দিয়ে এক ধরনের ভুরিভোজ করে নেয়। আর এতে কুমিরগুলোও ইনফেকশনের হাত থেকে বেঁচে যায়।

আমি যে গল্পটার কথা বলছি সেটার সাথে এই কুমিরের ঘটনার এক ধরনের মিল আছে। কুমিরের দাঁতের মাংসের টুকরো পাখিটা খেয়ে নিলে দুই পক্ষেরই লাভ। এই ধরনের সম্পর্ককে জীব বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন- সিমবায়োসিস। আমি যে গল্পটার কথা বলছি সেটাও একটা সিমবায়োসিসের গল্প, কিন্তু এই কুমির আর পাখির গল্পের চেয়ে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং।

—————————–

এই পৃথিবীতে প্রাণ বা কোষ মূলত দুই ধরনের হয়। একটা হলো সরল প্রাণ, এদের বলা হয় প্রোক্যারিওট, অন্যটা হলো জটিল প্রাণ, ইউক্যারিওট। কোষ শব্দটাকে স্কুলের জীববিজ্ঞান বইতে যেভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয় তাতে “জীবন” আর “কোষ” – কে একই অর্থে ব্যবহার করলে কিছুটা কনফিউজিং লাগতে পারে। কিন্তু কোষই মূলত প্রাণ। আমরা প্রাণ বলতে যে বহুকোষী জীবদের জানি, তারা সবাই ইউক্যারিওট। প্রোক্যারিওটরা বহুকোষী হয় না। এই পৃথিবীতে কোনো বহুকোষী প্রোক্যারিওট নেই। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনেকগুলো এককোষী প্রোক্যারিওট ব্যাকটেরিয়া মিলে এমনভাবে কলোনি তৈরি করে বাস করে, যা একটি একক প্রাণের মতো আচরণ করে।

এই পৃথিবীতে প্রথম দেড় থেকে দুই বিলিয়ন বছর ছিল এককোষী ব্যাকটেরিয়াদের রাজত্ব। তারপর দেড় দুই বিলিয়ন বছরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ধরনের বিচিত্র সব বহুকোষী জীব। তাহলে প্রথম দেড় দুই বিলিয়ন বছরের ইতিহাসটা কেন এত একঘেঁয়ে? কেন বহুকোষী জীবের আবির্ভাব ঘটতে এত সময় লাগল? আর এই বিশেষ সময়টাতে কি এমন ঘটল যে এককোষী জীব থেকে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির বহুকোষী জীবের জন্ম হলো?

এই বিশেষ সময়টাতে দুইটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে তৈরি হয়েছিল একটি সিমবায়োসিসের সম্পর্ক। সেই প্রেমের সম্পর্কই বদলে দিয়েছিল এই পৃথিবীর প্রাণের ইতিহাস। এই গল্পটা মূলত সেই প্রেমের কাহিনী। আবার, অন্যদিক থেকে চিন্তা করলে এটা একটা দাসত্বের গল্প।

আমাদের শরীর তৈরি হয়েছে ৩৭.২ ট্রিলিয়ন ইউক্যারিওটিক কোষ দিয়ে। এই কোষেগুলোর মধ্যে যে মাইট্রোকন্ড্রিয়া রয়েছে তা আজ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে ছিল স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া। এমনকি এদের নিজস্ব DNA বা জিনোম রয়েছে। রয়েছে গোলাকৃতির বেশ কয়েকটি ক্রোমোজোম। আজ থেকে প্রায় দেড় দুই বিলিয়ন বছর আগে আমাদের ইউক্যারিওট পূর্বপুরুষরা মাইট্রোকন্ড্রিয়াকে ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়াতে নিজেদের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিল, বলতে গেলে গিয়ে খাওয়ার জন্য। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়াদের কোষের বাইরে যে পর্দা বা মেমব্রেন ছিল, তা সেই আমাদের ইউক্যারিওটিক কোষের এনজাইম গলিয়ে ফেলতে পারেনি। ফলে ওরা অন্যদের কোষের মধ্যেই বাঁচতে শুরু করে। কিন্তু এতে এক মজার ঘটনা ঘটে। মাইটোকন্ডিয়ারা কোষের পরিবেশে শুধু যে বেঁচেই গেল তা নয়, বরং তারা পেল প্রচুর পরিমাণ পুষ্টি। তাও ফ্রি অফ কস্ট। কারণ কোষের যে সাইটোপ্লাজমের মধ্যে তারা থাকছে সেখানে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে মাইটোকন্ড্রিয়ারা বাই প্রডাক্ট হিসেবে যে ATP উৎপাদন করে সেটাকে বড় এককোষী জীবটা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারল। ফলে তাদের ফ্যাগোসাইটোসিসের মাধ্যমে পরিবেশ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করার উপর নির্ভরতা কমল। মেশিন যেমন তেলের সাহায্যে চলে, তেমনি এই ATP হলো জৈব মেশিনের তেল। এই ঘটনাকে আমি এখানে যেমন সরলভাবে বললাম, ঘটনাটা মোটেই তেমন সরলভাবে ঘটেনি। সরল ঘটনা মোটেই ইন্টারেস্টিং না। এই লেখাতে এতকিছু নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টা হযবরল হয়ে যাবে, তাই এখানে বিষয়টা মাত্রাতিরিক্ত শর্টকাটে বললাম।

শুধু যে মাইট্রোকন্ড্রিয়ারা এভাবে কোষের মধ্যে বাস করছে তা কিন্তু নয়। উদ্ভিদের কোষে যে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে সেটাও এক সময় স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া ছিল। এরা সূর্যের আলো থেকে শক্তি শোষণ করে কোষের জন্য শক্তি তৈরি করে। ক্লোরোপ্লাস্টেরও রয়েছে নিজস্ব জিনোম। আর তা এক ধরনের সায়ানো ব্যাকটেরিয়ার সাথে প্রায় হুবহু মিলে যায়।

আমাদের দেহে এখন যে মাইটোকন্ড্রিয়ারা আছে, তারা স্বাধীনভাবে বংশ বৃদ্ধি করে। কোষ বিভাজনের উপর তারা নির্ভর নয় । কিন্তু এই দীর্ঘ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসে তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা একটা ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গেছে। আমরা এখন যেমন আর মাইট্রোকন্ড্রিয়াদের ছেড়ে বাঁচতে পারব না, তেমনি তারাও আর আমাদের কোষ ছাড়া বাঁচতে পারবে না। বংশ বিস্তার স্বাধীনভাবে করলেও মাইট্রোকন্ড্রিয়াদের অনেকগুলো প্রোটিন তৈরি হয় খুব অদ্ভুতভাবে। এসব প্রোটিনের কিছু অংশের কোড রয়েছে তাদের নিজেদের জিনোমে, আর কিছু অংশ রয়েছে নিউক্লিয়াসে থাকা জিনোমে। অর্থাৎ, মাইট্রোকন্ড্রিয়ারা এখন আর কোষের বাইরে বাঁচতে পারবে না।

তবে মাইট্রোকন্ড্রিয়ারা আমাদের উপর যতটা নির্ভরশীল, আমরা বহুকোষী জীবেরা তার চাইতে অনেক বেশি নির্ভরশীল এই মাইট্রোকন্ড্রিয়া নামের প্রোটো-আলফা-ব্যাকটেরিয়াদের উপর। কি লেভেলের নির্ভরশীল তা একটি উদাহরণ দিলেই বুঝবেন। একটু আগে বলেছিলাম যে- এক ধরনের অনেকগুলো ইউক্যারিওটিক ব্যাকটেরিয়া মিলে এমন একটি কলোনি তৈরি করে, যে কলোনিটা সবাই মিলে একটি জীবের মত আচরণ করে। আমরা বহুকোষী জীবরাও কিন্তু তাই করি। আমাদের দেহের ট্রিলিয়ন ট্রিলিওন কোষ একত্রে মিলে আমাকে-আপনাকে ‘একটি জীব’ হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে। এদের প্রতিটা আলাদা কোষই মূলত আলাদা আলাদা জীবন। আপনি যদি আপনার শরীরের লিভার থেকে কিছু কোষ কেটে নিয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান দিয়ে কালচার করেন, তাহলে সেখানেও কোষগুলো দিব্যি বেঁচে থাকবে, এমনকি বংশবৃদ্ধিও করবে। তবে দেহের মধ্যে এরা সবাই মিলে একটি বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করছে। কিন্তু বহুকোষী জীবের দেহে কোষগুলো যেভাবে নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে কাজ করে, এর জন্য অনেক ত্যাগ করতে হয়। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক কোষকে সুইসাইড পর্যন্ত করতে হয়। অর্থাৎ দেহ নির্দেশ দিলে কিছু কোষকে বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদেরকেই মেরে ফেলতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অ্যাপোপটোসিস (Apoptosis)।

নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বা ভুলে কোটি কোটি কোষ মিলে একটি জীবন হিসেবে কাজ করার জন্য এই অ্যাপোপটোসিস খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন কোনো কোষ আর এভাবে পরের চাকরি করতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, তখনই শুরু হয় সমস্যা। কোষগুলো তখন নিজেদের মত স্বাধীনভাবে বাঁচতে শুরু করে, স্বাধীনভাবে বংশ বিস্তার করে। আপনার শরীরে যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটবে তখন আপনার ডাক্তার আপনাকে বলবে যে- আপনার ক্যান্সার হয়েছে। এজন্যই পাঠ্যবইতে লেখা হয়- ক্যান্সার হলো এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধি।

সে যাই হোক, বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন এ্যাপোপটোসিসের নির্দেশ দেওয়া হয় নিউক্লিয়াসে থাকা DNA থেকে। কিন্তু কয়েক বছর গবেষণার পর জানা যায় এই নির্দেশটা আসে মাইট্রোকন্ড্রিয়ার DNA থেকে। এজন্যই মূলধারার বিজ্ঞানীরা বলেন যে- মাইট্রোকন্ড্রিয়া ছাড়া বহুকোষী জীব সম্ভব না। এই যে বিলিয়ন বিলিয়ন কোষ একটি একক জীব হিসেবে কাজ করছে তার মূলেই সম্ভবত রয়েছে মাইট্রোকন্ড্রিয়ারা। এখনও পর্যন্ত এমন কোনো বহুকোষী জীব পাওয়া যায়নি যাদের কোনো মাইট্রোকন্ড্রিয়া নেই, বা কোনো এক সময় মাইট্রোকন্ড্রিয়া ছিল না।

শুধু এই দেহকোষের সুইসাইডই নয়, পৃথিবীতে যে দুইটি আলাদা সেক্স রয়েছে তার পেছনেও মূল কারিগর হিসেবে আছে এই মাইট্রোকন্ড্রিয়ারা। তবে এই কথাটি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। নিক লেনের লেখা বই- পাওয়ার, সেক্স, সুইসাইডে তিনি এর এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। অসাধারন এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে Oxford University Press থেকে। নিক লেন University College London এ ইভুলুশনারি বায়োকেমিস্ট্রির একজন প্রফেসর। 

এতক্ষনে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন যে- এই বইটি হলো মাইট্রোকন্ড্রিয়াদের গল্প। আমাদের জানা সবচেয়ে পুরনো গল্পগুলোর একটি।

বইটির ভাষা বেশ সহজ সরল, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বইটি তিনি সাধারণ পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লিখেছেন। প্রতিটি বিষয় সহজ ভাষায় বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। যখন প্রয়োজন হয়েছে তিনি সেখানে সেল বায়োলজি পর্যন্ত শিখিয়ে নিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Seraphinite AcceleratorBannerText_Seraphinite Accelerator
Turns on site high speed to be attractive for people and search engines.